মধুর ক্যান্টিন। একটা প্রজন্ম পর্যন্ত এটি একটি
ঐতিহাসিক জায়গা বলেই স্বীকৃত ছিল। সেই ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে অনেক
রাজনৈতিক গল্প, তারুণ্যের তেজের গল্প, সেই সময়ের বাংলাদেশের গল্প। ছাত্র
রাজনীতির জ্বলজ্বলে সূর্যটা আজ অস্তমিতপ্রায় বলেই হয়ত মধুর ক্যান্টিনও
হারিয়েছে সেই জৌলুস। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের কাছে এটি
শুধুই একটি ক্যান্টিন, যেখানে পাওয়া যায় না হালের গ্রীল চিকেন বা সাব
স্যান্ডউইচ। যেখানে বেশিরভাগ সময়ই থাকে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের ভিড়,
যাদেরকে সবাই এড়িয়েই চলতে চায়।
মধুর ক্যান্টিনের গোড়ার খোঁজ যদি শুরু করি তাহলে যেতে হবে অনেকটা পেছনে। সেই বৃটিশ আমলে। নবাব আহসানুল্লাহর নাচঘর ছিল এটি। তিনি ছিলেন ঢাকার নবাব। ১৮৪৬ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত তিনি নবাবী করেছেন। সারা ঢাকা জুড়ে ছিল ৩টি বাগান, তার একটি ছিল শাহবাগে। সেই বাগানের বৈঠকখানা, বিশ্রামাগার এবং নাচঘর ছিল আজকের মধুর ক্যান্টিন। তবে এটি এই দালানের ইতিহাসমাত্র। মধুর ক্যান্টিনের নয়।
মধুর ক্যান্টিন তার যাত্রা শুরু করে ঢাকা মেডিকেল কলেজের পাশে। তখন এটির নাম মধুর ক্যান্টিন ছিল না। আর ১০ টা খাবারের দোকানের মতোই একটি দোকান ছিল এটি। কি করে ধীরে ধীরে ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে গেল এই ক্যান্টিন আর নাম পেল 'মধু' সেই প্রসঙ্গে আসার আগে একটু জেনে নিই এর প্রতিষ্ঠাতার কথা।
১৯ শতকের কথা। বিক্রমপুরের শ্রীনগরের জমিদারদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠে নকরীচন্দ্রের। ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে তিনি ঢাকা আসেন। ১৯২১ সালের জুলাইয়ের ১ তারিখ যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে খাবারের ব্যবসা করার নিমিত্তে নকরীচন্দ্র তার ছেলে আদিত্যচন্দ্রকে দায়িত্ব দেন। তিনি ঢাকা মেডিকেলের সামনে ক্যান্টিন স্থাপন করেন। আদিত্যচন্দ্রের ছেলে ছিলেন মধুসূদন দে। পক্ষাঘাতে পিতার মৃত্যুর পর ক্যান্টিনের দায়িত্ব নেন মধুসূদন। বয়স তখন তার মাত্র ১৫ বছর। সততা এবং ভালো ব্যবহারের কারণে অচিরেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।
সময়টা ২য় বিশ্বযুদ্ধের। সারা বিশ্ব তখন ভয়ংকর অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেই উদ্বেগ ছুঁয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেও। এখানে শুরু হয় ডাকসুর কার্যক্রম, সাথে একটি স্থাপিত হয় একটি ক্যান্টিন। প্রিয় মধুদাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় ক্যান্টিনের। ডাকসুর ক্যান্টিন হলেও ক্রমে এটি 'মধুর চা স্টল', 'মধুর টি স্টল', 'মধুর স্টল' নামে খ্যাত হয়ে ওঠে। ১৯৬২ সালে ঢাকা মেডিকেলের সামনে থেকে মধুর ক্যান্টিন স্থানান্তরিত হয় বর্তমান কলাভবনের শিক্ষকদের লাউন্স রুমে। এখানেই চলে ৫ বছর। এরপর ১৯৬৭ সালে এটিকে বর্তমান অবস্থানে স্থানান্তর করা হয়, যেই ভবনটি একসময় ছিল নাচঘর তা পরিণত হয় মধুর ক্যান্টিনে। মজার ব্যাপার হলো ১৯০৬ সালে এই নাচঘরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুসলিম লীগ।
ছাত্র রাজনীতি এবং মধুর ক্যান্টিন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই এই অঞ্চলের মানুষ বুঝতে শিখেছিল অধিকার আদায় করে নিতে হয়। রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার ছিল বিশেষ করে মুসলিমরা। শিক্ষাগত দিক থেকে পিছিয়ে পড়তে পড়তে একসময় অর্থনৈতিক দিক থেকেও ক্ষতিগ্রস্থ হতে শুরু করে তারা। ইংরেজদের বৈষম্য তাদের মাঝে বহুবছর ভাতৃসম প্রেম নিয়ে একত্রে থাকা হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি ক্ষেপিয়ে তোলে। যার সুযোগে জাতিকে আরও বিভক্ত করতে বৃটিশরা নিয়ে আসে 'বঙ্গভঙ্গ'। মুসলিমরা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ছিলেন। প্রাদেশিক বিভাজন তাদের প্রতি সরকারকে আরও মনোযোগী করবে এবং এই অঞ্চলের মুসলিমদের ভাগ্য উন্নয়ন হবে এই ছিল তাদের আশা।
কিন্তু বাংলাকে বিভক্ত করে ইংরেজদের 'ডিভাইড এন্ড রুলস' পলিসিকে সফল হতে দেয়নি কংগ্রেস। ১৯০৫ সালে হওয়া বঙ্গভঙ্গ তাই ইংরেজ সরকার বাধ্য হয়ে রদ করেন ১৯১১ সালে। বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেই পথটাও সহজ ছিল না। স্যার নবাব সলিমুল্লাহ, এ. কে. ফজলুল হক সহ অন্যান্য বিজ্ঞ নেতৃবৃন্দের অক্লান্ত শ্রম রয়েছে এখানে। এতটা পথ পাড়ি দিয়ে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি তার সাথে জড়িয়ে আছে অনেক স্বপ্ন, তার চেতনার মান অন্য সব কিছুকে ছাড়িয়ে যাচ্ছিল দ্রুতই। এখানকার শিক্ষার্থীরা ছিলেন রাজনৈতিকভাবে সচেতন, নিজ অধিকারের পক্ষে লড়তে প্রস্তুত। ছাত্র জীবনের সমস্যা, সংকটই শুধু নয়, তাদের আন্দোলন, দাবি-দাওয়া ছিল দেশের সংকট নিয়ে, জাতির সংকট নিয়ে।
সময়টাই ছিল এরকম। ইংরেজদের একের পর এক রাজনৈতিক চালে কোণঠাসা হয়ে থাকা ভারতবর্ষের দিকে দিকে তখন মুক্তির আকুতি। সবকিছুর মাঝে এই ছিল যেন এক অনন্য অর্জন আমাদের। সে সময় গড়ে উঠেছিলেন এমন সব নেতারা যারা পরবর্তীতে নেতৃত্ব দিয়েছেন সমগ্র জাতিকে। যাদের নাম আমরা আজও স্মরণ করি। বস্তুত তাদের শ্রমের ফসলই ভোগ করছি আজও। এরপর নেতৃত্বের যে সংকট, যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে তা এখনও কালো ছায়ার মতো ছেয়ে আছে মানচিত্রের ওপর।
বাংলার নেতারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্ভ থেকেই জন্মলাভ করেছিল। আর তাদের সকল কার্যক্রমের কেন্দ্র হয়ে নেপথ্য থেকে সাহায্য করে যাচ্ছিল মধুর ক্যান্টিন। এটা যেন আর কোনো ক্যান্টিন নয়, পরিণত হয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যালয়ে। ১৯৪৮ সালে শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। ৪৯ এ চলে বিশবিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলন। ইতিহাসের পাতায় এরপর একে একে যোগ হতে থাকে ১৯৫২, ৫৪ এর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ১৯৫৮-৬০ সালের প্রতিক্রিয়াশীল বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ৬৬ সালের ৬ দফা, ৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ৭০ এর নির্বাচন আর অতঃপর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। সকল আন্দোলনের বৈঠক হত এখানে। অনেক গোপন বৈঠক হত যা কিনা শুধু মধুদা' জানতেন। সেসব গোপন বৈঠকের খাবার আর প্রয়োজনীয় সবই সরবরাহ করতেন মধুদা'। ক্যান্টিনের সামনের গোলঘর দু'টিতে বৈঠক তো হতোই, তৈরি হত ব্যানার, পোস্টার, প্লাকার্ডসহ দরকারি সব জিনিস।
আজকের বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম আর মধুর ক্যান্টিনকে পৃথক করা অসম্ভব একটি কাজ। তবে শুধু রাজনীতিবিদ নয়, মধুর ক্যান্টিন খেলাধূলা, সঙ্গীত, সাহিত্য সব ক্ষেত্রেই অবদান রেখেছে। মেধাবীদের আড্ডা মানেই যেন মধু্র ক্যান্টিন। উঠতি লেখক, ক্রীড়াবিদ, জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব সবার ঠিকানা এই একটাই। কবি শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আলী যাকের, আসাদুজ্জামান নূরসহ আরও অনেক সাহিত্যিক, কবি, নাট্যকারের বিকাশ হয়েছে এই ক্যান্টিনে বসেই। কে নতুন কি লিখেছেন, কার অসমাপ্ত লেখা কতদূর এগোলো, কার লেখা গানে এবার সুর কেমন হলো সবই জানতেন মধু দা'। মধুর ক্যান্টিনে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কবিতা লিখেছেন নির্মলেন্দু গুণও। তার মতো আরও অনেকেই এখনো বেঁচে আছেন তারা স্বয়ং মধুদা'কে দেখেছেন, তার সংস্পর্শ পেয়েছেন।
কাজ আর আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে চলত খাওয়া। অনেকেই দাম মেটাতেন আর অনেকে লিখে
রাখতে বলতেন। যে খাতায় বাকির খরিদ্দারদের নাম থাকত সেই খাতার নিজের ছিল
একটি মজার নাম। 'না দিয়া উধাও'! এই নামের কারণ আর কিছু নয়, একবার নাম উঠেছে
মানে সেই খাবারের বিল তারা আর দিতেন না! এই 'না দিয়া উধাও' খাতায় নাম ছিল
এককালীন মূখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান, শাহ আজিজ, শামসুর রহমান, আহমদ ফজলুর
রহমানসহ অনেক কৃতী ব্যক্তিত্বের। আরও ছিলেন মিজানূর রহমান শেলী,
মহীউদ্দীন, জিয়াউদ্দীন, কাজী জাফর আহমদ, আতাউর রহমান কায়সার, সাইফুদ্দিন
আহমেদ মানিক, রেজা আলী, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো, ওয়ালীউল
ইসলাম, কে এম ওবায়দুর রহমান, আবদুর রাজ্জাক, রফিক আজাদ প্রমুখ।
মধুদা যেন সকলকে বুকে আগলে রেখেছিলেন সে সময়। ব্যবসা কোনোদিনই মূল বিষয় ছিল না তার কাছে। নিজেই হয়ে গিয়েছিলেন রাজনীতির একটি অংশ। পাকিস্তান সরকারের কবল থেকে বহু নেতাকে রক্ষা করেছেন তিনি। নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছেন তো বটেই, সাহায্য করেছেন লুকিয়ে লুকিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রেও। গোপন পোস্টার, লিফলেট নিজের কাছে রাখতেন, পৌঁছে দিতেন, চিরকুটের মাধ্যমে খবর আদানপ্রদানে তিনিই ছিলেন ভরসা। গোপন সাক্ষাতের খবরগুলো শুধু তিনিই জানতেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সকল আন্দোলনকে সামনে এগিয়ে যেতে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করছিলেন মধুসূদন।
মধু দা' ক্যন্টিনের খাবার তৈরির সময় খেয়াল রাখতেন ছাত্রছাত্রীদের পকেটের দিকে। খুব দামী কিছু তৈরি করতেন না কখনো। ছোট ছোট মিষ্টি তৈরি করতেন। অসাধারণ সেই মিষ্টির খ্যাতি আজও জড়িয়ে আছে মধুর ক্যান্টিনের সাথে। শিঙ্গাড়া, সন্দেশ বা ছোট্ট একটা মিষ্টি আর এক চাপ চা এই ছিল ছাত্রদের প্রতিদিনের নাস্তা। বড়জোড় ৪ আনা দামে সকালের নাস্তা হয়ে যেত সে সময়। সেই ছোট মিষ্টি, ধোঁয়া ওঠা রং চা আজও পাওয়া যায়। শুধু এই মানুষটা নেই। সেই দিনগুলোও নেই।
একাত্তরের সেই কালো রাত
২৫ শে মার্চের কালো রাতে ধ্বংসযজ্ঞ চলে সমগ্র ঢাকায়। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সম্পূর্ণ হত্যাকান্ডটি ছিল পরিকল্পিত। কাদেরকে হত্যা করা হবে, কোথায় আগুন দেওয়া হবে, কোন স্থাপনা ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে সবই ছিল ঠিক করা। পাক বাহিনীর সেনারা সেদিন আর মানুষ ছিল না, পরিণত হয়েছিল ক্ষুধার্ত হায়েনার দলে। তাদের ধ্বংসের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল মধু ক্যান্টিনও। কিন্তু ঊর্দু বিভাগের এক শিক্ষক এটিকে রক্ষা করতে সমর্থ হন। ক্যান্টিন বেঁচে গেলেও বাঁচতে পারেননি মধু দা'। ২৬ মার্চ সকাল ৮ টায় মধুদা'র কোয়ার্টারের চারপাশে শুরু হয় তার খোঁজ। হানাদাররা জানত না তার বাসা কোনটি। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মচারী দেখিয়ে দেন। টিএসসি থেকে শহীদ মিনারের দিকে যেতে প্রধান সড়কের পাশে ৩ নং বিল্ডিং এ থাকতেন মধুদা' এবং তার পরিবার। পাক সেনারা ঢুকে পড়ে সেখানে। প্রথমে হত্যা করে মধুদা'র বড় ছেলে রণজিৎ কুমার ও তার স্ত্রী রিনা রানীকে। ক'দিন আগেই বিয়ে হয়েছিল তাদের। এরপর হত্যা করে মধুদা'র স্ত্রী যোগমায়া দে কে। মধুদা'কে নিয়ে যাওয়া হয় জগন্নাথ হলের মাঠে। সেখানে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তাকে।
গুলি করলে, মাটি চাপা দিলেই কিছু মানুষের মৃত্যু হয় না। মৃত্যুর আগেই তাদের কির্তী তাদের অমর করে দেয়। মধুসূদন দে তেমনই একজন মানুষ। জগন্নাথ হলের গণকবরে অগুণতি শহীদের মাঝে আছেন শহীদ মধুসূদন। যতদিন এই বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে টিকে থাকবে ততদিন মধুদা' বেঁচে থাকবেন। ইতিহাস কখনো আত্মত্যাগীদের ভোলে না।
বর্তমান অবস্থা
মধুক্যান্টিন এখন মুখে মুখে 'মধু' নামেই খ্যাত। রাজনৈতিক আড্ডা এখনো হয় এখানে। তবে সেইদিনের মতো কিংবদন্তী নেতা, সাহিত্যিক আর তৈরি হয় না! সমগ্র জাতিই এক বন্ধ্যাত্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর অসংখ্য ছাত্রছাত্রী পাশ করে বের হলেও আবার একজন অবিসংবাদী নেতা কবে তৈরি হবেন তা বলা যায় না। রাজনীতি মানে এখন হল দখল, দলীয় স্বার্থে মিছিল-মিটিং, ক্ষমতার প্রদর্শন, মাতৃ সংগঠনের ছায়ায় অযাচিত সুবিধা ভোগ। মেধাবীরা এখন আর ছাত্র রাজনীতি করেন না। যদিও বা কোনো মেধাবী ছাত্র রাজনীতি করতে আসেন এখানকার ব্যবসায়ী মানসিকতা আর ক্ষমতা বলে পাওয়া সুবিধা তার মেধাকে গ্রাস করে তাকেও পরিণত করে একজন সুবিধাবাদী ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদে।
মধুর ক্যান্টিনের জীর্ণ অবস্থা দেখে সত্যিই খারাপ লাগলো। রাজনৈতিক ব্যানারের কারণে ক্যান্টিনের নাম দেখা যায় না। বিকেলে সারা বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে ছাত্রছাত্রীদের পদচারণায় মুখর সেখানে মধুর ক্যান্টিন একেবারেই নীরব। মধুদা'র একটি ভাস্কর্য মোটামুটি ঠিক আছে। তবে লেখাগুলো পড়া যায় না। অপরটির অবস্থা খুবই খারাপ, ভগ্নদশা নিয়ে সেটি দাঁড়িয়ে আছে আজ বহুদিন যাবত। সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই। ক্যান্টিনের একদিকে একটি বোর্ডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদদের একটি তালিকা আছে। এটিও একপাশে ছিড়ে গেছে। পেছনে আবর্জনার স্তুপ।
মধু ক্যান্টিনের ইতিহাস, স্বাধীকার আন্দোলনে এর অবদানের কথা জানাতে অনেক রকম উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। বই বের করা, বোর্ডে সংক্ষীপ্ত ইতিহাস লিখে স্থায়ীভাবে টানানোর ব্যবস্থা করাসহ আরও অনেক কিছুই করা যায়। তরুণদের মাঝে জাতীয়তাবোধ জাগ্রত রাখতে হলে এসব কাজের খুবই প্রয়োজন। শুধু তারিখ হিসেব করে মধুদা'র জন্মদিন বা মৃত্যু দিবস পালন করে কোনো লাভ নেই। ছাত্ররা এখন যেমন রাজনীতিকে এড়িয়ে যায় তেমনই এসব দিবসকেও রাজনীতি কেন্দ্রিক মনে করে যুক্ত হয় না। মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধের পূর্বের ইতিহাস কোনো দলীয় সম্পত্তি নয়। এর উপর অধিকার আমাদের সবার। তাই উদ্যোগ হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের, উদ্যোগী হতে হবে স্বয়ং রাষ্ট্রকে।
মধুর ক্যান্টিনের গোড়ার খোঁজ যদি শুরু করি তাহলে যেতে হবে অনেকটা পেছনে। সেই বৃটিশ আমলে। নবাব আহসানুল্লাহর নাচঘর ছিল এটি। তিনি ছিলেন ঢাকার নবাব। ১৮৪৬ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত তিনি নবাবী করেছেন। সারা ঢাকা জুড়ে ছিল ৩টি বাগান, তার একটি ছিল শাহবাগে। সেই বাগানের বৈঠকখানা, বিশ্রামাগার এবং নাচঘর ছিল আজকের মধুর ক্যান্টিন। তবে এটি এই দালানের ইতিহাসমাত্র। মধুর ক্যান্টিনের নয়।
মধুর ক্যান্টিন তার যাত্রা শুরু করে ঢাকা মেডিকেল কলেজের পাশে। তখন এটির নাম মধুর ক্যান্টিন ছিল না। আর ১০ টা খাবারের দোকানের মতোই একটি দোকান ছিল এটি। কি করে ধীরে ধীরে ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে গেল এই ক্যান্টিন আর নাম পেল 'মধু' সেই প্রসঙ্গে আসার আগে একটু জেনে নিই এর প্রতিষ্ঠাতার কথা।
১৯ শতকের কথা। বিক্রমপুরের শ্রীনগরের জমিদারদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠে নকরীচন্দ্রের। ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে তিনি ঢাকা আসেন। ১৯২১ সালের জুলাইয়ের ১ তারিখ যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে খাবারের ব্যবসা করার নিমিত্তে নকরীচন্দ্র তার ছেলে আদিত্যচন্দ্রকে দায়িত্ব দেন। তিনি ঢাকা মেডিকেলের সামনে ক্যান্টিন স্থাপন করেন। আদিত্যচন্দ্রের ছেলে ছিলেন মধুসূদন দে। পক্ষাঘাতে পিতার মৃত্যুর পর ক্যান্টিনের দায়িত্ব নেন মধুসূদন। বয়স তখন তার মাত্র ১৫ বছর। সততা এবং ভালো ব্যবহারের কারণে অচিরেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।
সময়টা ২য় বিশ্বযুদ্ধের। সারা বিশ্ব তখন ভয়ংকর অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেই উদ্বেগ ছুঁয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেও। এখানে শুরু হয় ডাকসুর কার্যক্রম, সাথে একটি স্থাপিত হয় একটি ক্যান্টিন। প্রিয় মধুদাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় ক্যান্টিনের। ডাকসুর ক্যান্টিন হলেও ক্রমে এটি 'মধুর চা স্টল', 'মধুর টি স্টল', 'মধুর স্টল' নামে খ্যাত হয়ে ওঠে। ১৯৬২ সালে ঢাকা মেডিকেলের সামনে থেকে মধুর ক্যান্টিন স্থানান্তরিত হয় বর্তমান কলাভবনের শিক্ষকদের লাউন্স রুমে। এখানেই চলে ৫ বছর। এরপর ১৯৬৭ সালে এটিকে বর্তমান অবস্থানে স্থানান্তর করা হয়, যেই ভবনটি একসময় ছিল নাচঘর তা পরিণত হয় মধুর ক্যান্টিনে। মজার ব্যাপার হলো ১৯০৬ সালে এই নাচঘরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মুসলিম লীগ।
ছাত্র রাজনীতি এবং মধুর ক্যান্টিন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই এই অঞ্চলের মানুষ বুঝতে শিখেছিল অধিকার আদায় করে নিতে হয়। রাজনৈতিক বৈষম্যের শিকার ছিল বিশেষ করে মুসলিমরা। শিক্ষাগত দিক থেকে পিছিয়ে পড়তে পড়তে একসময় অর্থনৈতিক দিক থেকেও ক্ষতিগ্রস্থ হতে শুরু করে তারা। ইংরেজদের বৈষম্য তাদের মাঝে বহুবছর ভাতৃসম প্রেম নিয়ে একত্রে থাকা হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি ক্ষেপিয়ে তোলে। যার সুযোগে জাতিকে আরও বিভক্ত করতে বৃটিশরা নিয়ে আসে 'বঙ্গভঙ্গ'। মুসলিমরা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ছিলেন। প্রাদেশিক বিভাজন তাদের প্রতি সরকারকে আরও মনোযোগী করবে এবং এই অঞ্চলের মুসলিমদের ভাগ্য উন্নয়ন হবে এই ছিল তাদের আশা।
কিন্তু বাংলাকে বিভক্ত করে ইংরেজদের 'ডিভাইড এন্ড রুলস' পলিসিকে সফল হতে দেয়নি কংগ্রেস। ১৯০৫ সালে হওয়া বঙ্গভঙ্গ তাই ইংরেজ সরকার বাধ্য হয়ে রদ করেন ১৯১১ সালে। বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেই পথটাও সহজ ছিল না। স্যার নবাব সলিমুল্লাহ, এ. কে. ফজলুল হক সহ অন্যান্য বিজ্ঞ নেতৃবৃন্দের অক্লান্ত শ্রম রয়েছে এখানে। এতটা পথ পাড়ি দিয়ে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি তার সাথে জড়িয়ে আছে অনেক স্বপ্ন, তার চেতনার মান অন্য সব কিছুকে ছাড়িয়ে যাচ্ছিল দ্রুতই। এখানকার শিক্ষার্থীরা ছিলেন রাজনৈতিকভাবে সচেতন, নিজ অধিকারের পক্ষে লড়তে প্রস্তুত। ছাত্র জীবনের সমস্যা, সংকটই শুধু নয়, তাদের আন্দোলন, দাবি-দাওয়া ছিল দেশের সংকট নিয়ে, জাতির সংকট নিয়ে।
সময়টাই ছিল এরকম। ইংরেজদের একের পর এক রাজনৈতিক চালে কোণঠাসা হয়ে থাকা ভারতবর্ষের দিকে দিকে তখন মুক্তির আকুতি। সবকিছুর মাঝে এই ছিল যেন এক অনন্য অর্জন আমাদের। সে সময় গড়ে উঠেছিলেন এমন সব নেতারা যারা পরবর্তীতে নেতৃত্ব দিয়েছেন সমগ্র জাতিকে। যাদের নাম আমরা আজও স্মরণ করি। বস্তুত তাদের শ্রমের ফসলই ভোগ করছি আজও। এরপর নেতৃত্বের যে সংকট, যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে তা এখনও কালো ছায়ার মতো ছেয়ে আছে মানচিত্রের ওপর।
বাংলার নেতারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্ভ থেকেই জন্মলাভ করেছিল। আর তাদের সকল কার্যক্রমের কেন্দ্র হয়ে নেপথ্য থেকে সাহায্য করে যাচ্ছিল মধুর ক্যান্টিন। এটা যেন আর কোনো ক্যান্টিন নয়, পরিণত হয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যালয়ে। ১৯৪৮ সালে শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। ৪৯ এ চলে বিশবিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলন। ইতিহাসের পাতায় এরপর একে একে যোগ হতে থাকে ১৯৫২, ৫৪ এর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ১৯৫৮-৬০ সালের প্রতিক্রিয়াশীল বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ৬৬ সালের ৬ দফা, ৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ৭০ এর নির্বাচন আর অতঃপর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। সকল আন্দোলনের বৈঠক হত এখানে। অনেক গোপন বৈঠক হত যা কিনা শুধু মধুদা' জানতেন। সেসব গোপন বৈঠকের খাবার আর প্রয়োজনীয় সবই সরবরাহ করতেন মধুদা'। ক্যান্টিনের সামনের গোলঘর দু'টিতে বৈঠক তো হতোই, তৈরি হত ব্যানার, পোস্টার, প্লাকার্ডসহ দরকারি সব জিনিস।
আজকের বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম আর মধুর ক্যান্টিনকে পৃথক করা অসম্ভব একটি কাজ। তবে শুধু রাজনীতিবিদ নয়, মধুর ক্যান্টিন খেলাধূলা, সঙ্গীত, সাহিত্য সব ক্ষেত্রেই অবদান রেখেছে। মেধাবীদের আড্ডা মানেই যেন মধু্র ক্যান্টিন। উঠতি লেখক, ক্রীড়াবিদ, জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব সবার ঠিকানা এই একটাই। কবি শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আলী যাকের, আসাদুজ্জামান নূরসহ আরও অনেক সাহিত্যিক, কবি, নাট্যকারের বিকাশ হয়েছে এই ক্যান্টিনে বসেই। কে নতুন কি লিখেছেন, কার অসমাপ্ত লেখা কতদূর এগোলো, কার লেখা গানে এবার সুর কেমন হলো সবই জানতেন মধু দা'। মধুর ক্যান্টিনে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে কবিতা লিখেছেন নির্মলেন্দু গুণও। তার মতো আরও অনেকেই এখনো বেঁচে আছেন তারা স্বয়ং মধুদা'কে দেখেছেন, তার সংস্পর্শ পেয়েছেন।
মধুদা যেন সকলকে বুকে আগলে রেখেছিলেন সে সময়। ব্যবসা কোনোদিনই মূল বিষয় ছিল না তার কাছে। নিজেই হয়ে গিয়েছিলেন রাজনীতির একটি অংশ। পাকিস্তান সরকারের কবল থেকে বহু নেতাকে রক্ষা করেছেন তিনি। নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছেন তো বটেই, সাহায্য করেছেন লুকিয়ে লুকিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রেও। গোপন পোস্টার, লিফলেট নিজের কাছে রাখতেন, পৌঁছে দিতেন, চিরকুটের মাধ্যমে খবর আদানপ্রদানে তিনিই ছিলেন ভরসা। গোপন সাক্ষাতের খবরগুলো শুধু তিনিই জানতেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সকল আন্দোলনকে সামনে এগিয়ে যেতে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করছিলেন মধুসূদন।
মধু দা' ক্যন্টিনের খাবার তৈরির সময় খেয়াল রাখতেন ছাত্রছাত্রীদের পকেটের দিকে। খুব দামী কিছু তৈরি করতেন না কখনো। ছোট ছোট মিষ্টি তৈরি করতেন। অসাধারণ সেই মিষ্টির খ্যাতি আজও জড়িয়ে আছে মধুর ক্যান্টিনের সাথে। শিঙ্গাড়া, সন্দেশ বা ছোট্ট একটা মিষ্টি আর এক চাপ চা এই ছিল ছাত্রদের প্রতিদিনের নাস্তা। বড়জোড় ৪ আনা দামে সকালের নাস্তা হয়ে যেত সে সময়। সেই ছোট মিষ্টি, ধোঁয়া ওঠা রং চা আজও পাওয়া যায়। শুধু এই মানুষটা নেই। সেই দিনগুলোও নেই।
একাত্তরের সেই কালো রাত
২৫ শে মার্চের কালো রাতে ধ্বংসযজ্ঞ চলে সমগ্র ঢাকায়। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সম্পূর্ণ হত্যাকান্ডটি ছিল পরিকল্পিত। কাদেরকে হত্যা করা হবে, কোথায় আগুন দেওয়া হবে, কোন স্থাপনা ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে সবই ছিল ঠিক করা। পাক বাহিনীর সেনারা সেদিন আর মানুষ ছিল না, পরিণত হয়েছিল ক্ষুধার্ত হায়েনার দলে। তাদের ধ্বংসের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল মধু ক্যান্টিনও। কিন্তু ঊর্দু বিভাগের এক শিক্ষক এটিকে রক্ষা করতে সমর্থ হন। ক্যান্টিন বেঁচে গেলেও বাঁচতে পারেননি মধু দা'। ২৬ মার্চ সকাল ৮ টায় মধুদা'র কোয়ার্টারের চারপাশে শুরু হয় তার খোঁজ। হানাদাররা জানত না তার বাসা কোনটি। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মচারী দেখিয়ে দেন। টিএসসি থেকে শহীদ মিনারের দিকে যেতে প্রধান সড়কের পাশে ৩ নং বিল্ডিং এ থাকতেন মধুদা' এবং তার পরিবার। পাক সেনারা ঢুকে পড়ে সেখানে। প্রথমে হত্যা করে মধুদা'র বড় ছেলে রণজিৎ কুমার ও তার স্ত্রী রিনা রানীকে। ক'দিন আগেই বিয়ে হয়েছিল তাদের। এরপর হত্যা করে মধুদা'র স্ত্রী যোগমায়া দে কে। মধুদা'কে নিয়ে যাওয়া হয় জগন্নাথ হলের মাঠে। সেখানে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তাকে।
গুলি করলে, মাটি চাপা দিলেই কিছু মানুষের মৃত্যু হয় না। মৃত্যুর আগেই তাদের কির্তী তাদের অমর করে দেয়। মধুসূদন দে তেমনই একজন মানুষ। জগন্নাথ হলের গণকবরে অগুণতি শহীদের মাঝে আছেন শহীদ মধুসূদন। যতদিন এই বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে টিকে থাকবে ততদিন মধুদা' বেঁচে থাকবেন। ইতিহাস কখনো আত্মত্যাগীদের ভোলে না।
মধুক্যান্টিন এখন মুখে মুখে 'মধু' নামেই খ্যাত। রাজনৈতিক আড্ডা এখনো হয় এখানে। তবে সেইদিনের মতো কিংবদন্তী নেতা, সাহিত্যিক আর তৈরি হয় না! সমগ্র জাতিই এক বন্ধ্যাত্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর অসংখ্য ছাত্রছাত্রী পাশ করে বের হলেও আবার একজন অবিসংবাদী নেতা কবে তৈরি হবেন তা বলা যায় না। রাজনীতি মানে এখন হল দখল, দলীয় স্বার্থে মিছিল-মিটিং, ক্ষমতার প্রদর্শন, মাতৃ সংগঠনের ছায়ায় অযাচিত সুবিধা ভোগ। মেধাবীরা এখন আর ছাত্র রাজনীতি করেন না। যদিও বা কোনো মেধাবী ছাত্র রাজনীতি করতে আসেন এখানকার ব্যবসায়ী মানসিকতা আর ক্ষমতা বলে পাওয়া সুবিধা তার মেধাকে গ্রাস করে তাকেও পরিণত করে একজন সুবিধাবাদী ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদে।
মধুর ক্যান্টিনের জীর্ণ অবস্থা দেখে সত্যিই খারাপ লাগলো। রাজনৈতিক ব্যানারের কারণে ক্যান্টিনের নাম দেখা যায় না। বিকেলে সারা বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে ছাত্রছাত্রীদের পদচারণায় মুখর সেখানে মধুর ক্যান্টিন একেবারেই নীরব। মধুদা'র একটি ভাস্কর্য মোটামুটি ঠিক আছে। তবে লেখাগুলো পড়া যায় না। অপরটির অবস্থা খুবই খারাপ, ভগ্নদশা নিয়ে সেটি দাঁড়িয়ে আছে আজ বহুদিন যাবত। সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেই। ক্যান্টিনের একদিকে একটি বোর্ডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদদের একটি তালিকা আছে। এটিও একপাশে ছিড়ে গেছে। পেছনে আবর্জনার স্তুপ।
মধু ক্যান্টিনের ইতিহাস, স্বাধীকার আন্দোলনে এর অবদানের কথা জানাতে অনেক রকম উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। বই বের করা, বোর্ডে সংক্ষীপ্ত ইতিহাস লিখে স্থায়ীভাবে টানানোর ব্যবস্থা করাসহ আরও অনেক কিছুই করা যায়। তরুণদের মাঝে জাতীয়তাবোধ জাগ্রত রাখতে হলে এসব কাজের খুবই প্রয়োজন। শুধু তারিখ হিসেব করে মধুদা'র জন্মদিন বা মৃত্যু দিবস পালন করে কোনো লাভ নেই। ছাত্ররা এখন যেমন রাজনীতিকে এড়িয়ে যায় তেমনই এসব দিবসকেও রাজনীতি কেন্দ্রিক মনে করে যুক্ত হয় না। মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধের পূর্বের ইতিহাস কোনো দলীয় সম্পত্তি নয়। এর উপর অধিকার আমাদের সবার। তাই উদ্যোগ হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের, উদ্যোগী হতে হবে স্বয়ং রাষ্ট্রকে।
মধুর ক্যান্টিন? ঐতিহ্য ! ছাত্র রাজনীতি ! এবং বর্তমান অবস্থা ।
Reviewed by BANGLA TRAVEL
on
11:44
Rating:

No comments: